১৯৭০ এর দশকের জ্বালানি তেল সংকটের সময় কী হয়েছিল?

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৭৩ সালে আরব তেল উৎপাদকেরা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জ্বালানি তেলের ব্যাপক সংকট দেখা দেয়, ১৯৭৪ সালে জার্মানির রাস্তায়
    • Author, র‍্যাচেল ক্লান
    • Role, বিজনেস রিপোর্টার
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ মাসব্যাপী বন্ধ থাকায় এমন সতর্কতা জারি করা হয়েছে যে, পৃথিবী হয়ত ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও ভয়াবহ সমস্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং মায়ের্সকের সাবেক পরিচালক লার্স জেনসেন বিবিসি-কে বলেছেন, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব ১৯৭০-এর দশকে দেখা অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার চেয়ে 'যথেষ্ট বেশি' হতে পারে।

তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএর পরিচালক ফাতিহ বিরোলের এ মাসের শুরুর দিকের এক সতর্কবার্তারই প্রতিফলন।

বিরোল বলেছিলেন, বিশ্ব বর্তমানে 'ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির' সম্মুখীন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, "এটি ১৯৭০-এর দশকের তেলের দামের উর্ধগতির ধাক্কার চেয়েও অনেক বড়। এমনকি ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর আমরা যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের ধাক্কা অনুভব করেছি, এটি তার চেয়েও বড়।"

তবে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া বৈশ্বিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটালেও, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন আজকের বিশ্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি সহনশীল।

১৯৭০ এর দশকের তেল সংকটে কী হয়েছিল?

জ্বালানি খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টল এনার্জির প্রধান নির্বাহী এবং অর্থনীতিবিদ ড. ক্যারল নাখলে বিবিসিকে বলেছেন, ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট আজকের পরিস্থিতি থেকে 'মৌলিকভাবে ভিন্ন' ছিল।

"কারণ, সে সময়কার প্রথম তেলের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা ছিল 'একটি সুপরিকল্পিত নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল'।"

১৯৭৩ সালের অক্টোবরে, ইয়োম কিপুর যুদ্ধ, যেটি ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ নামেও পরিচিত, সে সময় ইসরায়েলকে সমর্থন করার কারণে আরব তেল উৎপাদকেরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একদল দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

সেসময় ওই নীতির পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে তেল উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৭৩ সালে জ্বালানি তেলের সংকট চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি

মি. নাখলে বলেন, "এর ফলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তেলের দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে গিয়েছিল।"

এর ফলে প্রধান তেল ব্যবহারকারী দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়।

আর তার ফলে একটি 'বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট' তৈরি হয়েছিল, যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, বলছেন মি. নাখলে।

কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের গবেষক ড. টিয়ার্নান হেনি বলেন, তেলের চড়া দাম সব ক্ষেত্রেই মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছিল।

"এ অর্থ হলো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের খরচ কমিয়ে দেয় এবং বেকারত্ব চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।"

তিনি বলেছেন, "এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল অর্থনীতিতে, যা অনেক দেশের সামাজিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ব্যাপক ধর্মঘট, বিক্ষােভ এবং দেশে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছিল, অনেক পরিবারই তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল।"

যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য উভয় দেশেই ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মন্দা চলেছিল।

ওই সংকট ১৯৭৪ সালে টেড হিথের কনজারভেটিভ পার্টি নেতৃাত্বাধীর সরকারের পতনের পেছনেও ভূমিকা রেখেছিল।

বর্তমান তেল সংকটে ঠিক কী হচ্ছে?

এক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তেহরানের অবরােধে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, কারণ এই দেশগুলো বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রপ্তানি করে থাকে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় তেলের প্রবাহ পুনরায় সচল করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন।

এর মধ্যে রয়েছে মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানানো এবং ইরান যদিএ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের অনুমতি না দেয়, তবে দেশটির ওপর আরও কঠোর হামলার হুমকি দেওয়া।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জ্বালানি তেলের সেই সংকট চলে দশক জুড়ে, ১৯৭৭ সালে নিউইয়র্কে এক নারী নিজের গাড়িতে নিজে গ্যাসােলিন ভরছেন

তবে, বর্তমানে ভেসপুচি মেরিটাইম নামক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মি. জেনসেন বিবিসির 'টুডে' প্রোগ্রামকে বলেছেন যে, এক মাস আগে উপসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে আসা তেলের বড় একটি অংশ এখনও বিশ্বের বিভিন্ন শোধনাগারে পৌঁছাচ্ছে, কিন্তু এ প্রবাহ শীঘ্রই বন্ধ হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, "আমরা তেলের যে ঘাটতি দেখছি তা কেবল আরও ঘনীভূত হবে, এমনকি যদি অলৌকিকভাবে আগামীকাল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হয় তবুও একই অবস্থা থাকবে।"

"আমরা জ্বালানি খরচের বিশাল চাপের মুখে পড়ব, যা কেবল এ সংকট চলাকালীন নয়, বরং এটি শেষ হওয়ার পরও ছয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হবে।"

বর্তমান সংকট কি ১৯৭০ এর দশকের তেল সংকটের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে?

আরব এনার্জি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মি. নাখলে বলেন, ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় বর্তমান তেলের বাজার অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়, আর সেই সাথে তেলের সামগ্রিক ব্যবহারের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তার বিশ্বাস, বর্তমান দাম চড়া হলেও আজকের সংকট ততটা তীব্র নয়।

তিনি বলেন, "যদিও আমরা তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখছি, এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসে সম্ভবত অন্যতম বৃহত্তম। তবুও, বাজার ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল।

বরং এটি এখন আরও বহুমুখী, তেলের ওপর কম নির্ভরশীল এবং আপদকালীন ব্যবস্থা ও বাফার স্টকের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও সুসজ্জিত।"

ছবির উৎস, Getty Images

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তবে, পণ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাটিক্সিস সিআইবির পরিচালক জোয়েল হ্যানকক একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

তার মতে, ১৯৭০-এর দশকের সংকট মূলত উন্নত দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হয়েছিল, যাদের এটি সামলানোর মতো অর্থ এবং 'রাজনৈতিক ক্ষমতা' ছিল।

বর্তমান সংকট মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, "যাদের এ সংকট ভালোভাবে মোকাবিলা করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক এবং রাজস্ব সক্ষমতার অভাব রয়েছে।"

তিনি আরও বলেন যে, ১৯৭০-এর দশকে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বর্তমানের মতো প্রাসঙ্গিক ছিল না।

হ্যানকক বলেন, আজকের এ সংকট "কেবল তখনই শেষ হবে, যখন যুদ্ধের তীব্রতা কমবে।"

হিনি জানান, বর্তমানে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা বিশ্বের অনুকূলে কাজ করছে, যেমন যে কোন দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের উন্নত ধারণা এবং অনেক দেশের কাছে তেলের রিজার্ভ থাকা।

তিনি আরও বলেন, "তবে,এখনকার প্রধান ঝুঁকি হলো, যদি এ সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে সামনের দিনের পরিস্থিতি আরও অস্পষ্ট হয়ে পড়বে।

সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো যত দ্রুত সম্ভব এ সংঘাত শেষ করা এবং স্থিতিশীলতার একটি পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।"