আর্টেমিস-২ নভোচারীরা কেন চাঁদে পা রাখবেন না?

ছবির উৎস, NASA/Getty Image

ছবির ক্যাপশান, ১৯৬৯ সালে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর মানুষ চাঁদের বুকে পা রাখে
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"প্রথমবারের মতো দুজন মহাকাশচারীকে যখন চাঁদে পাঠানো হয়েছিল, সেই ১৯৬৯ সালে নাসার পুরো দলের চেয়েও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা আছে এখন আপনার মোবাইল ফোনে"।

'কম্পিউটিং ক্ষমতা' নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানী মিচিও কাকুর এই বক্তব্যকে সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ ও যুক্তির দিক থেকে খণ্ডনও করা যেতে পারে।

এটা অস্বীকার করা যায় না যে, ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ অভিযানের সময় নীল আর্মস্ট্রংয়ের 'মানুষের জন্য এক ক্ষুদ্র পদক্ষেপ' নেওয়ার পর থেকে প্রযুক্তির অভাবনীয় বিবর্তন ঘটেছে।

অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২৪ জন নাসা মহাকাশচারী চাঁদে ভ্রমণ করেছেন। তবে, ১৯৭২ সালের পর থেকে আর কেউ এই প্রাকৃতিক ভূ-উপগ্রহে পা রাখেনি।

আর কেউ এখনি চাঁদে পা রাখতেও যাচ্ছেন না।

যদিও আর্টেমিস নামের নভোযানটি- যেটি ফ্লোরিডা থেকে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করেছে, সেটিকে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বলা হচ্ছে। তবে সেখানের চারজন মহাকাশচারীর কেউই চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখবেন না।

চাঁদে আবার কোনো মানুষের পা পড়তে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে অন্তত আর্টেমিস-৪ এর জন্য- যা ২০২৮ সালের বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

এখানে 'অন্তত' বলার কারণ হলো আর্টেমিস-২ এর চাঁদে অবতরণের কথা ২০২৪ এর নভেম্বরে হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তা অনেক দেরিতে হয়েছে।

নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কচ, ভিক্টর জে. গ্লোভার এবং জেরেমি হ্যানসেন ওরিয়ন মহাকাশযানে তাদের ১০ দিনের যাত্রাকালে ভবিষ্যতে অবতরণের প্রস্তুতিস্বরূপ চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবেন এবং বিভিন্ন রণকৌশল সম্পাদন করবেন। আগামী বছর আর্টেমিস-৩ মিশনের উৎক্ষেপণের উদ্দেশ্যে এটি করা হবে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে আমেরিকা যেটি ৫০ বছর আগেই অর্জন করেছে সেটির জন্য এখন কেন এতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা?

ছবির উৎস, NASA/Aubrey Gemignani/Handout/Anadolu via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাম থেকে নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন, ভিক্টর জে. গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ ও রিড ওয়াইজম্যান

অসাধারণ অর্জনের নেপথ্য

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মানবজাতির চাঁদে পদার্পণের এই বিশাল কীর্তিটি ব্যাখ্যা করা কঠিন। এমনকি 'বিশাল' ও 'কীর্তি' শব্দগুলোও যেন যথেষ্ট নয়।

সম্ভবত এর বিশালতা উপলব্ধি করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, এটা বলা যে নিল আর্মস্ট্রং বিংশ শতাব্দীর সেই অল্প কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন, যাকে ত্রিশ শতকেও মানুষ স্মরণ করবে।

কিন্তু তাতেও সেই হাজারো মানুষের কাজ ও মেধাকে কমানো হবে যাদের প্রচেষ্টায় ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই আর্মস্ট্রং ও এডউইন "বাজ" অলড্রিনের পক্ষে চাঁদে পা রাখা সম্ভব হয়েছিল, এই তারিখটি সকলের স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে।

চাঁদের এই কথিত "বিজয়" ঘটেছিল শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

যে প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এতোদিন পর্যন্ত জয়ী হয়ে এসেছে সেখানে এই অভিযান মহাকাশ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় এনে দিয়েছিল।

তবে চন্দ্রাভিযানটি একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত মাইলফলক হলেও এর ব্যয়বহুল অর্থায়নের পেছনে রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক উদ্দেশ্য ছিল।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক মাইকেল রিচ ২০১৭ সালে বিবিসি মুন্ডোকে বলেন, "বাস্তবে, যখন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদে ফিরে যাওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ ছিল না তখন কংগ্রেসকে এমন একটি বিপুল বাজেট অনুমোদন করতে রাজি করানো খুব কঠিন ছিল।"

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, এই কর্মসূচি চলাকালীন মার্কিন সরকার নাসাকে ফেডারেল বাজেটের প্রায় পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ করেছিল। ২০২৬ সালে, এর পরিমাণ ০.৩৫ শতাংশ।

কর্মসূচিটি ১৯৭২ সালে যখন বাতিল করা হয়, তখন "খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছিল ও এর অগ্রাধিকার বদলে গিয়েছিল," বলেন বিবিসির বিজ্ঞান সম্পাদক রেবেকা মোরেল।

তিনি আরো বলেন, "মনোযোগ সরে আসে আরও সাশ্রয়ী একটি গন্তব্যের দিকে যা হলো পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ। এই নতুন লক্ষ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ সম্ভবত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন''।

বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট 'দ্য কনভারসেশন'-এ পদার্থবিজ্ঞানী ডোমেনিকো ভিসিনানজা লিখেছেন "মহাকাশ ও পৃথিবী উভয় ক্ষেত্রেই টেকসই অভিযানের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অনুমানযোগ্য তহবিল এবং একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য।"

"অ্যাপোলো কর্মসূচির পর, যুক্তরাষ্ট্র এই তিনটি উপাদানকে একযোগে বজায় রাখতে হিমশিম খেয়েছে," তিনি আরও যোগ করেন।

আর্টেমিস কর্মসূচি এই তিন উপাদানকে আবারো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পেরেছিল।

ছবির ক্যাপশান, আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযান

নতুন করে শুরু

নাসার এই আর্টেমিস প্রোগ্রাম চালু করার আগে বেশ কয়েকটি মহাকাশ প্রকল্প বাতিল হয়েছিল।

২০১৭ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে হাজার হাজার মানুষ জড়িত এবং এখন পর্যন্ত এর আনুমানিক খরচ প্রায় ৯৩ বিলিয়ন (৯৩০০ কোটি) মার্কিন ডলার।

ভিসিনানজা অ্যাপোলোর বিষয়ে লিখেছেন, "অভিযান মডেলটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি এবং এটি যে টেকসই ছিল না তাও স্পষ্ট।"

এই অভিযানগুলোর পর থেকে অসংখ্য দিকের উন্নতি হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নভোচারীদের পুষ্টি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কম্পিউটিং ক্ষমতা।

তবে, আর্টেমিস অন্য একটি মানববাহী মহাকাশযানের জন্য উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল যেটিতে করে ২০২০ সালে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ২০১০ সালে সেই প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়।

এর ওয়েবসাইটে বলা হয়, "আর্টেমিস কর্মসূচির অধীনে, নাসা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং মঙ্গল গ্রহে প্রথম মানববাহী অভিযানের ক্ষেত্র তৈরি করতে চাঁদের আরও বেশি অংশ আবিষ্কার করতে নভোচারীদের আরও কঠিন অভিযানে পাঠানো হবে।"

এটি করার জন্য তারা প্রথমে চাঁদের কক্ষপথে একটি চন্দ্র মহাকাশ স্টেশন এবং চাঁদের পৃষ্ঠেই একটি ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করেছে। তবে এসবের আগে, তাদের চাঁদে ফিরে যেতে হবে।

ছবির উৎস, Luis Robayo / AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চাঁদের অপর অংশ, যা পৃথিবী থেকে আমরা দেখতে পাই না, সেখানে বিপজ্জনক পরিবেশ ও রহস্যময়তা থাকতে পারে

মোরেলের মতে, ২০২৮ সালের সময়সীমাটি বেশ "উচ্চাভিলাষী" পরিকল্পনা।

কারণ চাঁদে নামতে হলে "একটি ল্যান্ডার (যে যানে করে চাঁদে অবতরণ করা হয়) নির্বাচন, সেটি তৈরি করা ও পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়াও ভবিষ্যতের চাঁদে হাঁটার সময় মহাকাশচারীরা যে স্পেসস্যুট পরবেন, সেটির প্রস্তুতেও বিলম্ব হচ্ছে।"

আর্টেমিস প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে অন্যদিকে অ্যাপোলো প্রোগ্রামে নাসা সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে মহাকাশযানটির নকশা ও নির্মাণ করেছিল।

মার্কিন সংস্থাটি মহাকাশচারীদের চন্দ্র পৃষ্ঠে অবতরণ করানোর যান বা ল্যান্ডারের জন্য দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাকে নির্বাচন করেছে- ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ এবং জেফ বেজোসের সংস্থা ব্লু অরিজিনের নকশা করা একটি মহাকাশযান।

যে কোম্পানিই হোক, তাতে করে নভোচারীরা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছাবেন।

২০৩০ সালে একই অঞ্চলের জন্য চীনের পরিকল্পিত মানববাহী অভিযানের চেয়ে নিজেদের এগিয়ে রাখতে চাইছে নাসা। একারণেই মহাকাশ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই বেশি প্রাচুর্যপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে প্রবেশাধিকার চায়, কেননা চাঁদে দুর্লভ মৃত্তিকা মৌল, ধাতু ও জলের মতো সম্পদ রয়েছে। যদিও, ১৯৬৭ সালের জাতিসংঘ মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশই চাঁদের মালিক হতে পারবে না।

ব্রিটিশ নভোচারী হেলেন শারম্যান বিবিসিকে বলেন, "আপনি এর মালিক হতে পারবেন না, কিন্তু আপনি এটি ব্যবহার করতে পারবেন। আর একবার সেখানে গেলে, যতদিন ইচ্ছা ততদিন এটি আপনারই থাকবে।"

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার বিকালে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করেছে আর্টেমিস-২

অন্ধকার অংশ

চাঁদে পদচারণা হবে না বলেই এই নয় যে আর্টেমিস-২ অন্য যেকোনো অভিযানের মতোই।

সবকিছু যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে, তাহলে এই যাত্রার সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তটি হবে সোমবার যখন এই চার নভোচারী ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের দূরবর্তী অংশটি দেখতে পাবেন, তাও সশরীরে।

চীন ও ভারতের মহাকাশযানগুলো ইতোমধ্যেই এই রহস্যময় "অন্ধকার অংশ" অন্বেষণ করেছে, কিন্তু এখন তারা এটিকে পর্যবেক্ষণ করতে এবং পরবর্তী বিশ্লেষণের জন্য ছবিতে রেকর্ডও করতে পারবে।

প্রাচীন লাভা প্রবাহ ও বিশাল গর্ত সম্বলিত ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে, কারণ এই অঞ্চলটি সম্পর্কে জানা গেলে তা ভবিষ্যতের অভিযানগুলোকে সহায়তা করতে পারে। আর এই গোলার্ধটি, যা আমরা পৃথিবী থেকে দেখতে পাই না, তা বেশ ভিন্ন।

নাসা জানিয়েছে, আর্টেমিস-২ তিন ঘণ্টা ধরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে এলাকাটির উপর দিয়ে উড়ে যাবে এবং এই যাত্রাপথের একটি অংশে মহাকাশযানটির সাথে নাসার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

"যদিও এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে মানুষের চোখ হলো অন্যতম সেরা একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র," উড্ডয়নের আগে বলেছেন নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ।

কয়েক দিনের মধ্যেই, হয়তো এর মাধ্যমে আমরা মানবজাতির জন্য এই নতুন অগ্রগতির ঘটনা দেখতে পাবো।